পুতিন কেন যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চান?

রাশা যখন ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল তখন সমর বিশ্লেষকরা মনে করছিল যে, এটি ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টার যুদ্ধ হবে। ৪৮ ঘণ্টা থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন দখল করে নিবে রাশিয়া।

সমরবিদরা জানেন যে, রাশিয়ার যে সামরিক শক্তি সেই শক্তিতে ইউক্রেন দখল করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু তারপরও এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। আজ এ যুদ্ধের সাতদিন পূর্ণ হলো। প্রশ্ন উঠেছে যে, আসলে কি ইউক্রেন প্রতিরোধ করছে, নাকি পুতিন ইচ্ছে করে এই যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চাচ্ছেন?

সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন যে, পুতিন ইচ্ছে করেই এই যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চাচ্ছেন। এর পিছনে তার সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য এবং কৌশল রয়েছে। এই যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদী করলে শেষ পর্যন্ত পুতিন এবং রাশিয়া লাভবান হবে বলে কোন কোন বিশ্লেষক মনে করছেন। এর পেছনে তাদের যুক্তি হলো:

প্রথমত, যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে বিশ্বে মেরুকরণ হবে। রাশিয়া আরেকটি বিভক্ত বিশ্ব তৈরি করতে পারবে যেখানে মার্কিন একাধিপত্য খর্ব হবে। হয়তো প্রথমদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চীন এবং দু’একটি দেশ ছাড়া কেউই থাকবে না। কিন্তু আস্তে আস্তে এই বিভক্তির মাত্রা বাড়বে এবং আবার আশির দশকের মত একটা ভারসাম্যের পৃথিবী তৈরি হবে। এটিই পুতিনের প্রথম লক্ষ্য। এজন্য তিনি ইচ্ছে করেই যুদ্ধকে দীর্ঘমেয়াদি করছেন বলে অনেকে মনে করেন।

দ্বিতীয়ত, ইউরোপের বিপর্যয়। এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে সবচেয়ে বিপর্যস্ত হবে ইউরোপ। নানামুখী সংকটে পড়বে ইউরোপ এবং সেই সঙ্কট এখন শুরু হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেন যতটা না সংকটে পড়ছে, তারচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে ইউরোপ। বিশেষ করে লাখ লাখ শরণার্থী এখন ইউরোপে দিচ্ছে। এই শরণার্থীর ভার বহন করা করোনা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ইউরোপের জন্য একটা তীব্র চাপ হিসেবে সামনে আসবে। এছাড়াও রাশার গ্যাস এবং অন্যান্য বিনিয়োগ গুলো যখন বন্ধ হয়ে যাবে তখন তার একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। ফলে ইউরোপ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুরোপুরিভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এটি ইউরোপের জন্য একটি নতুন বিপর্যয় ডেকে আনবে। পুতিন চাইছেন যে, ইউরোপকে একটা বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলতে যেন রাশিয়ার জন্য তারা কখনোই হুমকি হতে না পারে।

তৃতীয়ত, পুতিন মনে করছেন এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে আবার তার সোভিয়েত তত্ত্ব সামনে চলে আসবে, অন্যান্য দেশগুলো আস্তে আস্তে রাশিয়ার আনুগত্য নিবে এবং ১৯৯১ সালের আগে যেভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সেভাবেই রাশা আর একটি বৃহৎ পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

চতুর্থত, পুতিন মনে করছেন যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হলে অভিভাবক বিশ্বে অভিভাবক হিসেবে চীনের উত্থান ঘটবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়বে। কারণ, এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পুতিন চীনকে পাশেই পাবে। আর চীন যখন পাশে থাকবে তখন সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক ভারসাম্য চীন-রাশিয়ার দিকে চলে যাবে, যেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি সংকটের কারণ হবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই যুদ্ধের মাধ্যমে রাশায় একটি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে বলে পুতিন মনে করছেন। আর যে সমস্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার ওপর দেয়া হচ্ছে সেই সমস্ত নিষেধাজ্ঞাগুলো আস্তে আস্তে অকার্যকর হয়ে উঠবে। তখন রাশার সঙ্গে প্রকাশ্য-গোপন সম্পর্ক করবে বিভিন্ন দেশ। আর যার ফলে শেষ পর্যন্ত মার্কিন এবং ইউরোপের একাধিপত্য খর্ব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Change